ডাইনোসর কেন বিলুপ্ত হলো?
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল এক বিশাল গ্রহাণু। ধুলো আর ঝুল ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে, ঢাকা পড়ল সূর্য। পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে এল, গাছপালা আর শৈবাল ঠিকমতো বাড়তে পারল না। খাবার ফুরোল তৃণভোজীদের, তাদের পিছু পিছু শিকারিদেরও। শেষে পাখি ছাড়া বাকি সব ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গেল। পাখিদের কিছু পূর্বপুরুষ অবশ্য টিকে যায়, তাই আজকের পাখিরাও ডাইনোসরদেরই দলের।
কোথায় পড়েছিল, আর পাথরটা কত বড় ছিল
জায়গাটার নাম চিক্সুলুব, মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে। আঘাতে সেখানে যে গর্ত তৈরি হয়েছিল, তা প্রায় দুশো কিলোমিটার চওড়া! এখন অবশ্য সেটা মাটি আর সাগরের নিচে চাপা পড়ে আছে। সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে তাকালে কোনো গর্তই চোখে পড়বে না।
আর মহাকাশ থেকে আসা পাথরটা নিজেই ছিল দশ কিলোমিটারেরও বেশি চওড়া। তুলনা করে দেখো: আমাদের কার্ডের ডিপ্লোডোকাস ২৭ মিটার লম্বা, পরপর তিনটে স্কুলবাসের সমান। আর ওই গ্রহাণু ছিল গোটা একটা শহরের চেয়েও বড়! সেই আঘাতের চিহ্ন বিজ্ঞানীরা আজও স্পষ্ট দেখতে পান। সারা পৃথিবীতে মাটির নিচে আছে কাদার এক পাতলা স্তর, তাতে ঠাসা ইরিডিয়াম ধাতু। পৃথিবীর ওপরের পাথরে এই ধাতু পাওয়া ভার, অথচ গ্রহাণুতে থাকে অনেক বেশি। খোদ ওই গর্তের ভেতরেও মিলেছে ঠিক একই স্তর।
ঠান্ডা নামল, ছিঁড়ে গেল খাদ্যশৃঙ্খল
আঘাতের জায়গার আশপাশে তো সব ছারখার হয়েছিলই, কিন্তু বিপদ সেখানেই থামেনি। বাতাসে ভেসে থাকা ধুলো আর ঝুল সূর্যের আলো আটকে দিল, পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে এল। গাছপালা আর শৈবাল কমে যেতেই খাবার হারাল তৃণভোজীরা। তারা কমে গেলে বিপদে পড়ল মাংসাশীরাও।
কে কাকে খেয়ে বাঁচে, এই শিকলটাকেই বলে খাদ্যশৃঙ্খল। বড় প্রাণীর রোজ অনেক খাবার লাগে, অথচ কিছু ছোট প্রাণী অল্প খাবারেই টিকে যেতে পেরেছিল। গর্তে লুকিয়ে থাকা, কিংবা বীজ আর পোকামাকড় খেয়ে চালিয়ে নেওয়া — এসবও হয়তো কাউকে কাউকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল।
শেষ দিনটায় আসলে কারা ছিল
টাইরানোসরাস লম্বায় ১২ মিটার, ওজনে প্রায় ৮ টন। সে ছিল ক্রিটেশিয়াসের একেবারে শেষ দিকের প্রাণী, আজ থেকে ৬ কোটি ৮০ লক্ষ থেকে ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগের। নয় মিটার লম্বা ট্রাইসেরাটপসও সেই সময়েরই। গ্রহাণুর ধাক্কা এরাই সরাসরি দেখেছিল। ব্র্যাকিওসরাস বা স্টেগোসরাস কিন্তু দেখেনি। ওরা ছিল জুরাসিক যুগের প্রাণী, ওদের দিন ফুরিয়েছিল তারও কয়েক কোটি বছর আগে!
লোকে যখন জিজ্ঞেস করে, ‘ডাইনোসররা মারা গেল কীভাবে?’, তখন সাধারণত এই শেষ দিকের দানবদের কথাই ভাবে। গ্রহাণুর উত্তর খাটে ঠিক এদের বেলাতেই। জুরাসিকের গল্পটা আলাদা: আকাশ থেকে কোনো পাথর না পড়লেও তার আগে বহু প্রজাতি আপনা থেকেই বদলেছে, হারিয়েও গেছে।
পাখিদের কিছু পূর্বপুরুষ বেঁচে গেল, টি. রেক্স কেন পারল না?
পাখিরা আসলে ছোট, পালকওয়ালা থেরোপড ডাইনোসরদের একটা শাখা। গ্রহাণুর আঘাতের পর পাখিদের কয়েকটি বংশধারা টিকে গেল, আর বাকি সব ডাইনোসর বিলুপ্ত হলো। কুমির আর কচ্ছপের কিছু পূর্বপুরুষও সেই বিপর্যয় পার করে বেঁচে ছিল।
ঠিক কেন কিছু পাখি বাঁচল, তার পুরো উত্তর এখনো জানা নেই। হয়তো কাজে দিয়েছিল ছোট শরীর, কিংবা বীজ থেকে শুরু করে নানা রকম খাবার খেয়ে চালিয়ে নেওয়ার অভ্যাস। তবে সব প্রাচীন পাখি কিন্তু বাঁচেনি। এই আত্মীয়তার গল্প পড়তে চাইলে ‘পাখি কি ডাইনোসর?’ গাইডটা খুলে দেখো।
আগ্নেয়গিরিও তখন ফুঁসছিল
ঠিক সেই সময়ে, আজ যেখানে ভারত, সেখানে বিশাল সব আগ্নেয়গিরি থেকে বয়ে চলেছিল লাভার বন্যা। তাতেও বাতাস আর চারপাশের পরিবেশ অনেকটা বদলে গিয়েছিল। কিন্তু সারা পৃথিবীতে মাটির নিচে ধুলো আর ছাইয়ের যে বিশেষ স্তর দেখা যায়, তার সময় হুবহু মেলে গ্রহাণুর আঘাতের সঙ্গে, কোনো আলাদা অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে নয়।
মানে, আগ্নেয়গিরিও ফেটেছিল, গ্রহাণুও আছড়ে পড়েছিল। তবে গ্রহাণুর ওই প্রচণ্ড ধাক্কা ছাড়া মাটির নিচের সেই স্পষ্ট দাগের কোনো ব্যাখ্যা মেলে না!
বাচ্চারা যা জানতে চায়
- ডাইনোসর কেন বিলুপ্ত হলো?
- প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে যায়, ভেঙে পড়ে খাদ্যশৃঙ্খল। পাখি ছাড়া বাকি সব ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়। পাখিদের কিছু পূর্বপুরুষ অবশ্য টিকে গিয়েছিল।
- গ্রহাণুটা কোথায় পড়েছিল?
- মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে, চিক্সুলুবে। সেখানে প্রায় ২০০ কিলোমিটার চওড়া এক গর্ত তৈরি হয়, যা এখন মাটি আর সাগরের নিচে চাপা পড়ে আছে।
- সব ডাইনোসরই কি মারা গিয়েছিল?
- না। পাখি ছাড়া বাকি সব ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল। পাখিদের কিছু পূর্বপুরুষ বেঁচে যায়, আর তাদের বংশধরেরাই আজকের পাখি।
- আগ্নেয়গিরির জন্যই কি ডাইনোসররা শেষ হয়ে গেল?
- সেই সময় ভারতে বড় বড় অগ্ন্যুৎপাতও হচ্ছিল। তবু বিজ্ঞানীরা এই গণবিলুপ্তির প্রধান কারণ মনে করেন গ্রহাণুর আঘাতকেই। তার প্রমাণ মেলে সারা পৃথিবীতে একই সময়ের পাথরের স্তরে।
- টাইরানোসরাস আর স্টেগোসরাস কি একই দিনে মারা গিয়েছিল?
- একদমই না! স্টেগোসরাস ছিল জুরাসিক যুগের প্রাণী। টি. রেক্স আসার বহু কোটি বছর আগেই সে বিদায় নিয়েছিল।
- ডাইনোসররা কি আবার ফিরে আসতে পারে?
- এখনো না। টি. রেক্সের মতো ডাইনোসরের ক্লোন বানাতে অক্ষত ডিএনএ লাগে, আর তেমন ডিএনএ কোথাও মেলেনি। পাখিদের অবশ্য ফিরে আসার দরকারই পড়েনি — ওরা আজও আমাদের চারপাশে।
মনে রেখো
- যেদিন পাথরটা পড়েছিল, সেদিনের ছবি আঁকলে শুধু বিস্ফোরণ নয় — ধুলোয় ঢাকা আকাশ আর শুকিয়ে যাওয়া গাছপালাও এঁকো!
- স্টেগোসরাস আর টি. রেক্স বেঁচে ছিল আলাদা সময়ে। সিনেমায় একসঙ্গে দেখালেও বাস্তবে ওদের কখনো দেখা হয়নি।
- উঠোনে চরে বেড়ানো মুরগিটা কুমিরের চেয়ে টি. রেক্সের বেশি কাছের আত্মীয়। এটা বানানো গল্প নয়, খাঁটি বিজ্ঞান!